নবদ্বীপ নামকরণ এর ইতিহাস

নবদ্বীপ নামকরণ এর ইতিহাস

নবদ্বীপ Nabadwip ধাম ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের নদিয়া জনপদের একটি সুপ্রাচীন ঐতিহ্যবাহী শহর ও পৌরসভা এলাকা। নবদ্বীপ চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মস্থান ও সন্ন্যাসপূর্ব লীলাক্ষেত্রের জন্য বিখ্যাত। নবদ্বীপ পৌরসভা ১৮৬৯ সালে স্থাপিত। বাংলায় সেন রাজাদের আমলে নবদ্বীপ ছিল রাজধানী। ১২০২ সালে রাজা লক্ষ্মণসেনের সময় বখতিয়ার খলজি নবদ্বীপ জয় করেন, যা বাংলায় মুসলিম সাম্রাজ্যের সূচনা করে।

মহাপ্রভু চৈতন্যদেবের সময়ে বাসুদেব সার্বভৌম, রঘুনাথ শিরোমণি, স্মার্ত রঘুনন্দন প্রমুখ এবং পরবর্তীতে কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ, বুনো রামনাথ প্রমুখের পাণ্ডিত্যে তৎকালীন সময় থেকে নবদ্বীপ সংস্কৃতচর্চা ও বিদ্যালাভের পীঠস্থান হয়ে ওঠে। নবদ্বীপ ছিল সেই সময়ে বিদ্যালাভের পীঠস্থান ও একে বলা হত বাংলার অক্সফোর্ড। পশ্চিমবঙ্গ হেরিটেজ কমিশন ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে নবদ্বীপকে ঐতিহ্যবাহী বা হেরিটেজ শহর হিসেবে ঘোষণা করে।

নবদ্বীপ নামের উৎস সম্বন্ধে নানা ধারণা প্রচলিত আছে। নবদ্বীপ ও নদিয়া এই দুটি নামই এই জনপদে প্রচলিত ছিল। এই শহর বহুবার বৈদেশিক আক্রমণের শিকার হওয়ায় উচ্চারণের বিকৃতির মাধ্যমে নদিয়া ও নবদ্বীপ দুটি পৃথক নামের সৃষ্টি হয়। নবদ্বীপ ভাষান্তরের কারণে বিভিন্ন বিদেশী লেখকের লেখনীতে 'নূদীয়া' 'নওদিয়া' বা 'নদীয়াহ' নামে প্রকাশ পেয়েছে।

রজনীকান্ত চক্রবর্তী স্পষ্ট জানিয়েছেন, "মিনহাজউদ্দিন সিরাজির গ্রন্থে নবদ্বীপকে 'নওদিয়ার' বলা হইয়াছে। নওদিয়ার শব্দে নূতন দেশ।" নূতন দেশ বলতে এখানে গঙ্গাবিধৌত পলিসঞ্জাত নতুন দ্বীপকেই বোঝান হয়েছে।কবিকর্ণপুর তাঁর চৈতন্য চরিতামৃতাম্ মহাকাব্যে নবদ্বীপকে নবীন দ্বীপং বলে উল্লেখ করেছেন। ষোড়শ শতাব্দীতে নুলো পঞ্চানন বলেছেন, কহেন রাজা কাহার কথা অভিলাশ।

নব নব দ্বীপপুঞ্জ নবদ্বীপে প্রকাশ। লক্ষ্মণসেনের সমসাময়িক এডু মিশ্র নবদ্বীপ সম্বন্ধে বলেছেন, গঙ্গাগর্ভোস্থিত দ্বীপ দ্বীপপূঞ্জৈবর্হিধৃত। প্রতিচ্যাং যস্য দেশস্য গঙ্গাভাতি নিরন্তরম।নবদ্বীপ নামটির প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় কৃত্তিবাস ওঝার রামায়াণে।নবদ্বীপের ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত সেন যুগ থেকে পাওয়া গেলেও বিভিন্ন ঐতিহাসিক পাল যুগে এবং শূরবংশে নবদ্বীপের উল্লেখ করছেন। সমসাময়িক লেখমালা ও পুঁথিপত্রে আদিশূরের উল্লেখ পাওয়া না যাওয়ায় অনেক ইতিহাসবিদ আদিশূরকে ঐতিহাসিক চরিত্র হিসেবে না মানলেও ঐতিহাসিক ভিনসেন্ট আদিশূরের অস্তিত্ব স্বীকার করেছেন।

ইংরেজ ঐতিহাসিক নবদ্বীপকে আদিশূরের রাজধানী বলে উল্লেখ করেছেন।বুনো রামনাথ, শঙ্কর তর্কবাগীশ প্রমুখ নৈয়ায়িক অষ্টাদশ শতকে ন্যায়চর্চায় নবদ্বীপের নাম উজ্জ্বল করেছিলেন। নদিয়া রাজপরিবারের মহারাজ রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সময়ে নবদ্বীপে শক্তি পূজার প্রসার ঘটে। রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় এবং পরবর্তীতে রাজা গিরীশচন্দ্রের সময়ে নবদ্বীপে শাক্তরাস যাত্রার জনপ্রিয়তা ও জৌলুস বৃদ্ধি পায়। এই সময়ে নবদ্বীপে বিভিন্ন মন্দির-প্রতিমা প্রতিষ্ঠিত হয়।

[ আরও পড়ুন চেরাপুঞ্জি ]