ঊষা গাঙ্গুলি | বাংলা নাট্যজগতের অন্যতম স্তম্ভ ঊষা গাঙ্গুলি

ঊষা গাঙ্গুলি | বাংলা নাট্যজগতের অন্যতম স্তম্ভ ঊষা গাঙ্গুলি

১৯৪৫ সালে রাজস্থানের যোধপুর শহরে জন্মগ্রহণ করেন। মাতৃভাষা হিন্দি হলেও বাংলা থিয়েটারে তিনি রেখেছেন অসামান্য কৃতিত্বের স্বাক্ষর। পরিচালক-অভিনেত্রী এবং সক্রিয় সমাজকর্মী হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন। সত্তর ও আশির দশকে কলকাতা শহরে হিন্দি থিয়েটারের রূপায়ণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন ঊষাদেবী। ১৯৭৬-এ রঙ্গকর্মী গ্রুপ থিয়েটার প্রতিষ্ঠা করেন, সেই দলের প্রযোজনায় 'মহাভোজ’, ‘রুদালি’, ‘কোর্ট মার্শাল’ এবং ‘অন্তর্যাত্রা’-র মতো নাটকগুলো পরিবেশিত হয়।

১৯৯৮-এ ‘সংগীত নাটক অ্যাকাডেমি’ থেকে ঊষা গঙ্গোপাধ্যায় পুরস্কার পেয়েছিলেন। এ ছাড়া ‘গুড়িয়া ঘর’ নাটকে অভিনয়ের জন্যে তিনি পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক শ্রেষ্ঠ অভিনেতার সম্মানও অর্জন করেছিলেন। উপমহাদেশের এই প্রখ্যাত নাট্যনির্দেশক ও অভিনয়শিল্পীর নাটকই ছিল জীবন। বলতেন, “আমার কোনও লাইফ নেই থিয়েটার ছাড়া। দুশোরও বেশি সদস্যের দল তৈরি করেছি। নব্বই জন নারী আছেন দলে, যাঁরা আমাদের দলের অভিনেত্রী। আমাদের একটা স্টুডিও থিয়েটারও আছে।

বিনোদিনী কেয়া চক্রবর্তীকে এক সময় অবজ্ঞা করা হয়েছিল, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই এই স্টুডিয়ো। স্টুডিও থিয়েটারের নাম বিনোদিনী মঞ্চ, যেখানে পরিকল্পনা, চিন্তা ও কাজ একযোগে হচ্ছে। একটা অল্টারনেটিভ হাব গড়ে তোলার চেষ্টা হচ্ছে। যাঁরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন, প্রয়োগধর্মী কাজ করছেন, তাঁদের একটা স্পেস তৈরি করার চেষ্টায় মগ্ন হয়ে আছি”। ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতার ভবানীপুর এডুকেশন সোসাইটি কলেজে একজন শিক্ষিকা হিসেবে ঊষা গাঙ্গুলি তার কর্মজীবন শুরু করেন, যেটা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক অনুমোদিত। ওই একই বছর তিনি সংগীত কলা মন্দিরের সঙ্গে অভিনয় জীবন শুরু করেন এবং তার প্রথম অভিনয় হল, মিট্টি কি গাড়ি (শূদ্রক লিখিত 'মৃচ্ছকটিকম' ভিত্তিক) (১৯৭০), যেখানে তিনি নটী বসন্তসেনার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন।

তিনি ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দে অবসর গ্রহণ করা পর্যন্ত কলকাতার পাশাপাশি ভবানীপুর এডুকেশন সোসাইটিতে একজন হিন্দি লেকচারারের শিক্ষকতা চালিয়ে যান। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারিতে তিনি রঙ্গকর্মী নামে এক থিয়েটার গ্রুপ গঠন করেন। প্রথম দিকে একজন নৃত্যশিল্পী হিসেবে তালিম নেওয়ার সময় এই গোষ্ঠী বাইরের পরিচালকদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, যেমন 'মা'-এর পরিচালক অ্যানবেস, ইবসেন-এর এ ডল'স হাউস অনুসরণে তৃপ্তি মিত্র পরিচালিত 'গুড়িয়া ঘর'; তিনি নিজে নাট্য পরিচালনার আগে পর্যন্ত রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত এবং বিভাস চক্রবর্তির পাশাপাশি তৃপ্তি মিত্র এবং মৃণাল সেনের কাছে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।

তিনি ১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দের দশকে তার পরিচালনর কাজ শুরু করেন এবং অল্পদিনের মধ্যেই তার কর্মচাঞ্চল্যের ধারা এবং নবীন প্রজন্মকে নিয়ে শৃঙ্খলাবদ্ধ ঐকতানে বড়ো ধরনের পরিবর্তন এনে শহরের হিন্দি থিয়েটারে একটা পুনরুত্থান ঘটাতে সক্ষম হয়েছিলেন। তার গুরুত্বপূর্ণ নাট্যকর্মগুলো হল: ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দের মনু ভাণ্ডারি লিখিত উপন্যাস ভিত্তিক মহাভোজ (গ্রেট ফিস্ট), ১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দে রত্নাকর মতকারি কৃত লোককথা (ফোকটেল), ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে নাট্যকার মহেশ এলকুঞ্চওয়ার কৃত হোলি এবং ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে মহাশ্বেতা দেবী লিখিত গল্পে তার নিজস্ব নাট্যরূপ দেওয়া রুদালি, বের্টোল্ড ব্রেশট-এর মাদার কারেজ অনুসরণে হিম্মত মাঈ এবং নাট্যকার স্বদেশ দীপক লিখিত বিখ্যাত কোর্ট মার্শাল। কাশিনাথ সিং-এর উচ্চাঙ্গের লেখা কাশি কা আসি থেকে কানে কৌন কুমতি লাগি-এর ওপর ভিত্তি করে ২০০৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি কাশিনামা নাটকের নাট্যরূপ দেন এবং নিজে একটা সম্পূর্ণ নাটক লেখেন খোজ।

ঊষা গাঙ্গুলি ছিলেন বিবাহসূত্রে বাঙালি। রাজস্থানে জন্ম, ছেলেবেলাতেই বাবা সপরিবার যোধপুর ছেড়ে চলে আসেন কলকাতায়। বারবার বলতেন যে এ শহরে না এলে তাঁর নাচ শেখা বা থিয়েটারের কোনওটাই হত না।  এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্টই স্বীকার করেছিলেন যে, "কলকাতাকে ছেড়ে আমি বাঁচব না। এখানে না এলে আমি স্বাধীনভাবে চিন্তা করতেই শিখতাম না!"  যাঁরা নাটক সম্পর্কে বিন্দুমাত্র খোঁজখবর রাখেন, তাঁরা জানেন যে, ঊষা গাঙ্গুলির দল ‘রঙ্গকর্মী’ হিন্দি থিয়েটার করলেও বাঙালি দর্শকের বড়ো আপন ছিল, ভাষা তাঁর বিষয়ের গভীরতার সামনে বাধা তৈরি করতে পারেনি।

‘কোর্ট মার্শাল’, ‘কাশীনামা’, ‘মহাভোজ’ ‘হোলি’র মতো অজস্র মঞ্চসফল নাটক করেছে তাঁর দল, কিন্তু জনপ্রিয়তা বা পরিচিতির নিরিখে 'রুদালি', 'চণ্ডালিকা', 'হিম্মত মাই' বা 'হাম মুখতারা' অনেক বেশি এগিয়ে থাকবে। ঊষা গাঙ্গুলির নাটক মানেই তথাকথিত ‘ফেমিনিস্ট’ থিয়েটার, এমনটাই জানতেন সাধারণ দর্শক।১৯৮০-র দশক থেকে এ পর্যন্ত বাংলার পাশাপাশি গোটা ভারতে প্রায় চল্লিশটি কাজ ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি। নতুন থিয়েটারের ভাবনার পাশাপাশি সমাজ জীবনের সুখ-দুঃখের শৈল্পিক উপস্থাপনে সম্মান ও শ্রদ্ধা লাভ করেছেন সর্বত্র। প্রতিবেশী দুই দেশ পাকিস্তান ও বাংলাদেশেও সমান ভাবে আদৃত হয়েছেন ঊষা। এ বাংলার কোণে কোণে নিয়মিত নাট্যচর্চায় রত নাট্যদলের কাছে তিনি ছিলেন পরম প্রিয়জন। দেখা হলেই জানতে চাইতেন ঋত্বিক কী করছে, যুগাগ্নি কী করছে? বহরমপুর রঙ্গাশ্রমের খবর কী?

দু’হাজার সালের গোড়ার দিকে ‘বহিরঙ্গন’ নামে একটি অঙ্গন নাটকের ফোরাম তৈরি হয়েছিল। সেখানে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা দেখেছি। যাঁরা এই ধরনের বিকল্প নাটক নিয়ে কাজ করছেন তাঁদের সেই ফোরামে এনে নাট্যচর্চার বিস্তার এবং কী কী উপায়ে তার প্রসার হতে পারে তার কথা ভেবে যেতেন নিরন্তর। কর্মশালা ভিত্তিক নাট্যনির্মাণে তিনি ছিলেন বেশি উৎসাহী। তিনি নিজে নৃত্যশিল্পী হওয়াতে তাঁর নির্মিত প্রযোজনাগুলি আকর্ষণীয় চিত্রসহযোগে মঞ্চে প্রতিফলিত হত। মাইয়াত, ইন্সপেক্টর মাতাদিন চাঁদপর, কাশীনামা নাটকে দেখেছি ছন্দ এবং কোরিওগ্রাফের মধ্যে দিয়ে দর্শককে বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করাচ্ছেন।

বেদনা, হতাশা, ক্লান্তি সবটাই যেন ধরা আছে সেই সব প্রযোজনার চলনে। গভীর নিষ্ঠা, শৃঙ্খলা এবং নিয়মিত চর্চার মধ্যে দিয়ে রঙ্গকর্মী নাট্যদলকে বাংলার নাট্য আন্দোলনে প্রথম সারিতে নিয়ে গিয়েছিল। প্রথাগত কাজ করার পরিবর্তে বিকল্প স্পেস এবং ভাবনা নিয়ে কাজ করার দিকে মনোনিবেশ করতেন তিনি। ‘বিনোদিনী কেয়া’ স্টুডিও মঞ্চ তারই ফসল।বেঁচে থাকুক তাঁর স্বপ্নের রঙ্গকর্মী ও বিনোদিনী কেয়া স্টুডিও থিয়েটার। ১৯৭২ সাল থেকে আজ অবধি প্রায় ৪৮ বছর নিরলস নাট্যকর্মে নিবেদিত ছিলেন ঊষা গঙ্গোপাধ্যায়।