শক্তি মন্ডল এর জীবনী

শক্তি মন্ডল এর জীবনী

শক্তি মণ্ডল Shakti mondal  ছিলেন এক বিশিষ্ট লেখক, প্রাবন্ধিক, সমাজকর্মী, সাক্ষরতা ও জনশিক্ষা আন্দোলনের অগ্রণী ব্যক্তিত্ব। ভারতে আধুনিক রীতিতে সাক্ষরতা আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ সত্যেন মৈত্র ও ড. ফুলরেণু গুহর পর জাতীয় পর্যায়ে তিনি পশ্চিমবঙ্গের তৃতীয় ব্যক্তি হিসাবে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। ড. সুশীলা নায়ার লিটারেসি পুরস্কারসহ বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মানে সম্মানিত হয়েছেন। 

শক্তি মণ্ডলের জন্ম ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১ লা অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর-হুগলি-বাঁকুড়া জেলার সীমান্তবর্তী কাদড়া গ্রামে। পিতা সুধীর মণ্ডল ও মাতা শঙ্করী দেবী। শক্তি মণ্ডলের স্কুলের পড়াশোনা নিকটবর্তী সেলামপুর প্রাথমিক ও বদনগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে। তারপর গড়বেতা কলেজ হয়ে, মেদিনীপুর কলেজ থেকে স্নাতক হন।

এখানে পড়াশুনার সঙ্গে তার কাজ ছিল জনসেবা মূলক কাজে অংশ গ্রহণ ও ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ায়। কলেজে ও স্থানীয় এলাকায় বেশ পরিচিত ছিলেন তিনি। কলেজের পড়া শেষ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এর সায়েন্স কলেজ থেকে মনোবিজ্ঞানে এম. এ. পাশ করেন। বামপন্থায় বিশ্বাসী শক্তি মণ্ডল অবশ্য ১৯৬৫-৬৬ খ্রিস্টাব্দে ছাত্রাবস্থাতেই ছাত্র ও কৃষক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন।

কৃষক আন্দোলন থেকে দাবি ওঠে লাঙ্গল যার জমি তার। অজস্র মানুষের সমর্থনে আন্দোলন চলতে থাকে। তাকে অবরুদ্ধ করার জন্য সত্তরের দশকে নিবর্তনমূলক আটক আইনে বিনা বিচারে এক বছর কারারুদ্ধ করে রাখা হয়। জেলে গিয়ে তিনি জেল বন্দীদের নিয়ে সমাজ বদলের আন্দোলন গড়ে তোলেন। সেই কারণে বারে বারে তাকে এক জেল থেকে অন্য জেলে স্থানান্তরিত করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষে ড. ফুলরেণু গুহর নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণামূলক প্রকল্পে যুক্ত হন। ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে ওয়েস্ট বেঙ্গল কমপ্রিহেন্সিভ এরিয়া ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন তথা পশ্চিমবঙ্গ সামগ্রিক অঞ্চল উন্নয়ন পর্ষদের জলপাইগুড়ি ফালাকাটা প্রকল্পে যোগ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। সেসময় দেশে শুরু হয় জাতীয় বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রম।

সামগ্রিক অঞ্চল উন্নয়নের অঙ্গ হিসাবে বয়স্কদের শিক্ষাদানকে তিনি অগ্রাধিকার দেন। পরবর্তীতে মালদার রতুয়া ও পুরুলিয়া জেলার অযোধ্যা পাহাড় অঞ্চলে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে সাঁওতাল, মুন্ডা প্রভৃতি আদিবাসীদের মধ্যে বনসৃজন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামগ্রিক উন্নয়নে দৃষ্টান্তমূলক কাজ করেন। ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে ভারতে সাক্ষরতা আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ সত্যেন মৈত্রর আহ্বানে যোগ দেন তার পিতা দ্বিজেন্দ্রনাথ মৈত্রর প্রতিষ্ঠিত 'বেঙ্গল সোস্যাল সার্ভিস লিগে' এবং লিপ্ত হন 'বারাসাত-ব্যারাকপুর গ্রামীণ শিক্ষা প্রকল্প এর প্রকল্প সমন্বয়কারী হিসাবে।

শক্তি মণ্ডলের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা ও নিপুণ পরিচালনায় সারা ভারতে অন্যতম আদর্শ প্রকল্প হিসাবে বিবেচিত হয়। কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থানুকূল্যে এবং প্রখ্যাত নাট্যকার বিভাস চক্রবর্তীর পরিচালনায় প্রশিক্ষণে ব্যবহারের উপযোগী তথ্যচিত্র "বয়স্ক শিক্ষার বিশেষ পদ্ধতি" তৈরি করেন। শক্তি মণ্ডলের কাজে সত্যেন মৈত্র খুশি হয়ে রাজ্য উপকরণ কেন্দ্রে যোগ দিতে আহ্বান জানান। অতঃপর সি.এ.ডি.সি. কাজ ছেড়ে ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে রাজ্য উপকরণ কেন্দ্রেই যোগ দেন। 

শক্তি মণ্ডল সাক্ষরতা ও জনশিক্ষা আন্দোলনের জন্য বহু পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। তবে তার অনন্য অবদানের স্বীকৃতি মিলেছে ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় স্তরের "ড.সুশীলা নায়ার লিটারেসি অ্যাওয়ার্ড" প্রাপ্তিতে। সাক্ষরতার সাথে জড়িত তার নিজের "ব্যবহারিক ও আর্থিক সাক্ষরতা প্রকল্প-২০১৫"-এ উপকৃত দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ফলতা সাক্ষরতা কেন্দ্রের শিক্ষার্থীদের হৃদয়ের স্বীকৃতি যা ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে হায়াৎনগর সুভাষ সমিতিতে প্রদত্ত হয়েছিল, তাকে তিনি জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্মাননা হিসাবে নিজে উল্লেখ করেন।শক্তি মণ্ডল কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে ২০২১ খ্রিস্টাব্দের ৬ ই মে কলকাতায় প্রয়াত হন।