রেবতী ভূষণ ঘোষ এর জীবনী

রেবতী ভূষণ ঘোষ এর জীবনী

রেবতীভূষণ ঘোষ  Rebotibhusan ghosh একজন খ্যাতনামা বাঙালি কার্টুনিস্ট ও ছড়াকার।  ভারতের প্রথম অ্যামিনেশন ফিল্ম মিচকে-পটাশ-এর চরিত্রাঙ্কন করেছিলেন।রেবতীভূষণের জন্ম ১৯২১ খ্রিস্টাব্দের ৫ই সেপ্টেম্বর বৃটিশ ভারতের অধুনা পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলার বালিতে। পিতা যতীন্দ্রমোহন ঘোষ ও মাতা বিরাজমোহিনী দেবী।

রেবতীভূষণ জন্মভিটা থেকে কিছুটা দূরে বেলুড়ে বসবাস করতেন। তার ডাক না ছিল রতনমণি। পরে তিনি অনেক কার্টুনচিত্রে "রতন" নামটি ব্যবহারও করেছেন। ছোটবেলা থেকেই তার ছবি আঁকার ঝোঁক ছিল। তার প্রাথমিক পড়াশোনা বালি ব্যারাকপুর মিডিল ইংলিশ স্কুলে। ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন রিভার্স টমসন স্কুল থেকে।

উত্তরপাড়া কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত পড়ে ভর্তি হন কলকাতার রিপন কলেজে তথা বর্তমানের সুরেন্দ্রনাথ কলেজে। সংস্কৃতে অনার্স সহ বি.এ পাশ করেন। প্রথাগত শিক্ষা ছাড়াই তিনি নিজে নিজেই চর্চা করেছেন। 'সচিত্র শিশির' পত্রিকায় বিনয়কৃষ্ণ বসুর আঁকা কার্টুন দেখে উৎসাহিত হন।

রিপন কলেজের ম্যাগাজিনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তিন নায়ক - হিটলার, মুসোলিনি ও স্টালিনকে নিয়ে তার প্রথম কার্টুনটি 'ত্র্যহস্পর্শ' নামে ছাপা হয়েছিল। কলেজ পত্রিকায় প্রথম এই কার্টুন ছাপা হলেও তখনকার বহুল প্রচারিত সাময়িক পত্রিকা ‘সচিত্র ভারত’ এর প্রথম পাতায় তার কার্টুনের আত্মপ্রকাশ ঘটল ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে।

কার্টুনটির নাম ছিল ‘স্বরাজ সাধন’ — শোষিত মানুষের উপর শোষক ধনবানের চিরন্তন পীড়ন। রেবতীভূষণ কার্টুনের পাশাপাশি পেন্টিং ও ড্রয়িংও করতেন।স্নাতক হওয়ার পর রেবতীভূষণ বার্মা শেল কোম্পানিতে চাকরি নেন এবং এর মধ্যে তার পিতৃবিয়োগ ঘটে যায়। কিন্তু ভারতীয় শিল্পের পাঠ নেওয়ার জন্য ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে তিনি বালি থেকে সাইকেলে বরাহনগরে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নতুন ঠিকানা 'গুপ্তনিবাস'-এ যাতায়াত শুরু করেন।

চিত্রকলার নানান বিষয়ে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে পাঠ নেন দীর্ঘ নয় বৎসর। অবশ্য এর মধ্যেই ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তার প্রথম ব্যঙ্গপ্রতিকৃতি 'ল্যাংচা মিত্র'। ওদের ইংরাজী পত্রিকা 'হিন্দুস্থান স্টান্ডার্ড'-এ আঁকতে থাকেন রাজনৈতিক কার্টুন। এরপর আনন্দবাজার পত্রিকা ও দেশ পত্রিকায় নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হতে থাকে তার ব্যঙ্গচিত্র ও অলংকরণ।

১৯৪৭-৪৮ খ্রিস্টাব্দে 'সত্যযুগ' পত্রিকায় ব্যঙ্গচিত্র আঁকেন। ১৯৫০ এর দশকে যুগান্তর পত্রিকায় আঁকেন ছড়া ও কার্টুন সহ "ব্যঙ্গ বৈঠক"। এই সময়েই বাংলা প্রকাশনার অলংকরণের জগতে শৈল চক্রবর্তী ও রাজনৈতিক কার্টুন জগতে পিসিয়েল তথা প্রফুল্লচন্দ্র লাহিড়ী স্বমহিমায় কাজ করে চলেছেন। কিন্তু রেবতীভূষণ নিজস্ব শৈলীতে এঁকে চলেছেন মাতৃভূমি, অচলপত্র, যষ্টিমধু, শনিবারের চিঠি, উল্টোরথ,

দৈনিক বসুমতী, যুগান্তর, সত্যযুগ, কৃষক, জলসা, বসুধরা, বেতার জগৎ, সিনেমা জগৎ, অমৃত, শারদীয়া যুগান্তর, শারদীয়া আনন্দবাজার, নবকল্লোল, ইত্যাদি পত্রপত্রিকায় এবং নিজগুণে ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা লাভ করেন। ইতোমধ্যে বার্মা শেলের চাকরি ছেড়ে কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু ধর্মঘটে যোগ দেওয়ায় তার সে চাকরি চলে যায়।

তারপর তিনি পেশাদার শিল্পী হয়ে ওঠেন এবং শৈল চক্রবর্তীর মতোই তিনি ফ্রিলান্সিং করতে থাকেন। প্রেমেন্দ্র মিত্রের ঘনাদাকে কমিক্সে রূপ দেবার ব্যাপারে অগ্রগণ্য ভূমিকা গ্রহণ করেন তিনি। ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে ভারতের প্রখ্যাত কার্টুনিস্ট ও ‘শংকরস্ উইকলি’-র সম্পাদক কেশব শঙ্কর পিল্লাই এর আহ্বানে দিল্লি চলে যান। দিল্লিতে পিল্লাই প্রতিষ্ঠিত চিলড্রেনস বুক ট্রাস্ট কার্যালয়ে ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে সিনিয়র আর্টিস্ট হিসাবে কাজ করেন। খ্যাতনামা কার্টুনিস্ট রেবতীভূষণ ২০০৭ খ্রিস্টাব্দের ৩০শে ডিসেম্বর পরলোক গমন করেন।