হাওড়া জেলা

হাওড়া জেলা

হাওড়া Howrahজেলা ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত প্রেসিডেন্সি বিভাগের একটি জেলা। জেলা সদর হাওড়া। জেলার রাজনৈতিক সীমানার উত্তরে হুগলি জেলা; দক্ষিণে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা, কলকাতা ও পূর্ব মেদিনীপুর জেলা; পশ্চিমে পূর্ব মেদিনীপুর জেলা; পূর্বে উত্তর চব্বিশ পরগনা, কলকাতা ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলা অবস্থিত।

হুগলি নদী এই জেলার পূর্ব সীমানা বরাবর প্রবাহিত; এবং রূপনারায়ণ নদ পূর্ব মেদিনীপুর জেলার সঙ্গে হাওড়া জেলার প্রাকৃতিক সীমানা নির্দেশ করছে। আয়তনের বিচারে পশ্চিমবঙ্গের উনিশটি জেলার মধ্যে হাওড়া জেলার আয়তন অষ্টাদশ।১৯৩৭ সালে হাওড়া জেলা একটি স্বতন্ত্র জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৬৩ সালে এই জেলাটি প্রেসিডেন্সি বিভাগের অন্তর্ভুক্ত হয়।

হাওড়া জেলা বৃহৎ ও মাঝারি শিল্পের জন্য বিখ্যাত। জেলার হুগলি নদীর তীরবর্তী শহরগুলি কার্পাস বয়ন, পাট, ধাতুশিল্প, কাগজ প্রভৃতি শিল্পে বিশেষ সমৃদ্ধ। হাওড়া পৌরসংস্থা পশ্চিমবঙ্গের ছয়টি পৌরসংস্থার অন্যতম। ঐতিহাসিক উদ্ভিদ উদ্যান আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু বটানিক্যাল গার্ডেন ও রামকৃষ্ণ মিশনের প্রধান কার্যালয় বেলুড় মঠ এই জেলার প্রধান পর্যটন কেন্দ্র।

হাওড়া জেলায় প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন খুব বেশি পাওয়া যায় না। তবে বাগনান, শ্যামপুর, জগৎবল্লভপুর ইত্যাদি কয়েকটি থানার কয়েকটি গ্রামে খননকার্য চালিয়ে সামান্য কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে। এছাড়া অন্যান্য জেলার মতো হাওড়া জেলাতেও পোড়ামাটির কারুকার্য সহ অনেক প্রাচীন মন্দিরের অস্তিত্ব রয়েছে।প্রাচীন জৈন, বৌদ্ধ বা হিন্দু সাহিত্যে হাওড়া অঞ্চলের সুনির্দিষ্ট উল্লেখ নেই।

গ্রিক বা চৈনিক লেখকদের রচনাতেও এই অঞ্চলের কোনো বিবরণ পাওয়া যায় না। তবে গবেষকদের ধারণা, প্রাচীনকালে রাঢ়ের অন্তর্গত সুহ্ম অঞ্চলের দক্ষিণাংশ হাওড়া ও অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলা নিয়ে গঠিত ছিল। প্রাচীনকালে দক্ষিণ রাঢ়ের ভূরী শ্রেষ্মীক নামক অঞ্চলটিও বর্তমান হাওড়ার আমতা-উদয়নারায়ণপুর-ডিহি ভুরশুট অঞ্চলে অবস্থিত ছিল।

অনুমিত হয়, খ্রিষ্টীয় অষ্টম থেকে দশম শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে বর্তমান হাওড়া অঞ্চলের ভূরিশ্রেষ্ঠ ছিল একটি সমৃদ্ধ বাণিজ্যনগরী। খ্রিষ্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীতে বর্তমান হাওড়া জেলার উলুবেড়িয়া মহকুমার একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চল উড়িষ্যা রাজ্যের অধীনে ছিল।

মধ্যযুগে পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম প্রধান বন্দর ছিল সপ্তগ্রাম। এই সময় সরস্বতী নদীপথে বর্তমান হাওড়া জেলার মধ্য দিয়েই সপ্তগ্রাম পর্যন্ত বাণিজ্যপথটি প্রসারিত ছিল। পরবর্তীকালে সরস্বতী নদীর নাব্যতা কমে গেলে ভাগীরথী ও সরস্বতী নদীর সঙ্গমস্থলে অবস্থিত হাওড়ার বেতর সপ্তগ্রামের বিকল্প বন্দর হিসেবে উন্নতি লাভ করে।

বিপ্রদাস পিপলাইয়ের মঙ্গলচণ্ডী কাব্যে বেতরের উল্লেখ পাওয়া যায়। ১৫৫৩ সালে ডি ব্যারোজ অঙ্কিত মানচিত্রে হাওড়া জেলার কয়েকটি স্থানের নাম পাওয়া যায়। ১৭৭৯-৮০ সালের রেনেলের মানচিত্রেও বেতোড় ও শিবপুর অঞ্চলের নাম পাওয়া যায়।

বিংশ শতাব্দীর পূর্বে পৃথক জেলা হিসেবে হাওড়ার কোনো অস্তিত্ব ছিল না। ১৭৬০ সালে এই অঞ্চলটি বর্ধমানের অন্তর্গত হয়। ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার দেওয়ানি লাভের পর হাওড়া ব্রিটিশদের অধিকারভুক্ত হয়। ১৭৯৫ সালে বর্ধমান জেলা থেকে হুগলি জেলাকে পৃথক করা হয়। হাওড়া জেলা সেই সময় হুগলি জেলার অন্তর্গত ছিল।

১৯১৭-১৮ সালে ফৌজদারি বিচারের ক্ষেত্রে হাওড়া জেলা হুগলি জেলা থেকে পৃথক ছিল। অবশ্য রাজস্ব ও দেওয়ানি বিচারের ক্ষেত্রে সেই সময়ও এই জেলা হুগলি জেলারই অন্তর্গত ছিল। ১৯৩৮ সালের ১ জানুয়ারি হাওড়া জেলা একটি পূর্ণাঙ্গ স্বতন্ত্র জেলার মর্যাদা পায়। স্বাধীনতার পরও হাওড়া জেলা বর্ধমান বিভাগের অন্তর্গত ছিল। ১৯৬৩ সালে এই জেলা প্রেসিডেন্সি বিভাগের অন্তর্ভুক্ত হয়।১৯৬৫ সালের ২৪ জুলাই হাওড়া শহর কলকাতার ন্যায় পৌরসংস্থা বা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের মর্যাদা পায়।