কেরলে নিপা ভাইরাসের ভয়, উদ্বেগ বাড়ছে বাংলাতেও

কেরলে নিপা ভাইরাসের ভয়, উদ্বেগ বাড়ছে বাংলাতেও

নিপা ভাইরাসের(Nipah Virus) সংক্রমণ নিয়ে হইচই হচ্ছে কেরলে। একটা সময় কেরল, কর্নাটক থেকে পশ্চিমবঙ্গেও থাবা বসিয়েছিল নিপা। ২০০১ সাল থেকে প্রায় প্রতি বছরই বাংলার বিভিন্ন জেলায় একটা দুটো করে নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর খোঁজ মেলে। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে নিপা মহামারীর মতো ছড়িয়েছিল এক সময়ে ২০০১ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়িতে নিপা ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়েছিল। ৬৬ জনের মৃত্যুর খবর মিলেছিল। স্বাস্থ্য দফতর জানিয়েছিল, সংক্রমণে মৃত্যুহার ৩ শতাংশের বেশি।

মাঝের কয়েকটা বছর নিপার আতঙ্ক সেভাবে ছড়ায়নি। ২০০৭ সালে ফের নিপা ফিরে আসে ভারতে। বাংলাদেশের সীমান্ত সংলগ্ন নদিয়াতে ভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ে। পুণের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ভাইরোলজির বিশেষজ্ঞরা উত্তরবঙ্গ ও ধুবুরি থেকে ফল খাওয়া বাদুড়ের ১০৭টি নমুনা সংগ্রহ করেছিল ২০১৫ সালে। কোচবিহারে ৩৯টি নমুনার মধ্যে ৬টি ও ধুবুরিতে সংগ্রহ করা ৬০টি নমুনার মধ্যে ৩টি বাদুড়ের নমুনায় মিলেছে নিপা ভাইরাস চিহ্নিত করা গিয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, ধুবুরি ও কোচবিহারে জনবসতি অঞ্চলে প্রচুর বাদুড় আছে।

তাদের মধ্যে নিপা পজিটিভ বাদুড় থাকায় সেখানকার মানুষজনের মধ্যে সংক্রমণ বেশিমাত্রায় ছড়িয়েছিল। ২০০১ ও ২০০৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি ও নদিয়ায় নিপা সংক্রমণে ৪৭ জনের প্রাণ গিয়েছিল। ২০০১ সালে বাংলাদেশেও নিপা ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়েছিল সাঙ্ঘাতিকভাবে। এর পর ২০০৩, ২০০৪, ২০০৫ থেকে ২০১১ সাল অবধি— প্রতি বছরই নিয়ম করে বাংলাদেশে এই ভাইরাস বিভীষিকা ছড়িয়েছে। এখন করোনার বছরেও নিপা আক্রান্ত রোগীর খোঁজ মেলে। ২০১৮ সালের মে-জুন মাস নাগাদ করোনার মতোই নিপা ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়েও হইচই শুরু হয় দেশে। কেরলের কোঝিকোড়ে ভাইরাস আতঙ্ক ছড়াতে শুরু করে।

১৮ জনের শরীরে ভাইরাসের জিন খুঁজে পাওয়া যায়, মৃত্যু হয় অন্তত ১৭ জনের। প্রায় তিন হাজার জনকে আইসোলেশনে রাখা হয়। আক্রান্ত ও মৃতদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে নমুনা সংগ্রহ করে কনট্যাক্ট ট্রেসিং করেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। একজনের থেকে কতজনের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়েছে তা খুঁজে বের করার চেষ্টা হয়। ২০১৯ সালেও কেরলে নিপা ভাইরাস আক্রান্তের খোঁজ মেলে। তারপরে করোনা সংক্রমণ কালে নিপা নিয়ে সচেতনতার প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। এখন ফের এই ভাইরাস মাথাচাড়া দিয়েছে বলে খবর।

সরকারি সূত্রে খবর, কোঝিকোড়, ত্রিসূর এবং এরনাকুলামের সমস্ত সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিকগুলোকে সতর্ক করা হয়েছে। পাশাপাশি, মাইসোর, কোডাগু, উডুপি, শিবামোগা-সহ কর্ণাটকের বিভিন্ন জেলাতেও জারি হয়েছে সতর্কতা। নিপা ভাইরাসের সংক্রমণ হলে তার সঠিক কোনও চিকিত্‍সা পদ্ধতি এখনও বের হয়নি। ভ্যাকসিনও নেই। ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার ৩-১৪ দিনের মধ্যে উপসর্গ শুরু হয়। প্রথমে জ্বর মাথাব্যথার মতো লক্ষণ দেখা যায়। মনে হতে পারে ভাইরাল জ্বর।

কিন্তু কিছুদিন মধ্যেই সংক্রমণ বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে যেতে থাকে। রোগী প্রচণ্ড দুর্বল ও আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে, ভুল বকা শুরু হয়। বাড়াবাড়ি সংক্রমণে ২৪-৪৮ ঘণ্টার মধ্যে রোগী কোমা স্টেজে চলে যেতে পারে। মস্তিষ্কের প্রদাহ শুরু হয়, হৃদপেশিতেও প্রদাহ হয় অনেকের। এনসেফ্যালাইটিস ও মায়োকার্ডিটিসে আক্রান্ত হয় রোগী। নিপা থেকে বাঁচতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকে নজর দিতে বলছেন ডাক্তাররা। বাজার থেকে কিনে আসা মাংস ভাল করে ধুয়ে বেশি আঁচে রান্না করে খাওয়াই ভাল। নাকে-মুখে হাত দেওয়ার আগে বা খাবার খাওয়ার আগে হাত ভাল করে ধুয়ে নেওয়া, আক্রান্ত রোগীর থেকে নির্দিষ্ট দূরত্ব রাখা জরুরি। এক্ষেত্রেও মাস্ক পরার দিকে জোর দেন ডাক্তাররা, এন৯৫ মাস্ক পরে নিলে বিপদের আশঙ্কা কম থাকে।